বাংলা

ত্রিপুরার প্রতিটি দোকানের বিল আর বাকির হিসাব

বেত, কাপড়, আনারস বা মিষ্টি: বিল আর বাকি এবার খাতা ছেড়ে আপনার ফোনে।

রাস্তার পাশে তালগাছের নিচে একটা দণ্ড থেকে সারি দিয়ে ঝুলছে বেতের দোলনা চেয়ার
রাস্তার পাশে তালগাছের নিচে একটা দণ্ড থেকে সারি দিয়ে ঝুলছে বেতের দোলনা চেয়ার ছবি: Vijayanrajapuram, CC BY-SA 4.0

ত্রিপুরার কাউন্টারে হিসাব যেখানে গুলিয়ে যায়: গড়িয়ার ঢাক, খার্চির ভিড় আর পাহাড়ি পথে দেরি করা ট্রাক

  1. গড়িয়া আর খার্চি: বাইরে ঢাকের আওয়াজ, ভেতরে একসঙ্গে পাঁচ খদ্দের

    গড়িয়া আর খার্চি এলে সারা বছর যাঁরা দোকানে প্রায় আসেন না, তাঁরা একসঙ্গে ঢোকেন। একজনের চাই মালার সুতো, একজনের পরিবারের জন্য কাপড়, বাচ্চা চায় মিষ্টি, আর পড়শি বলেন টাকাটা আগামী সপ্তাহে দেবেন। দোকান বাঁশ আর টিনের চালা বা ছোট একটা ঘর। গোলমালে প্রতিটি বিক্রি মুখে বলা হয় আর পাতার এক কোণে লেখা হয়। রাতে বলতে পারেন না কোনটা নগদ, কোনটা বাকি আর কোনটা শুধু কথা দেওয়া।

  2. পাহাড়ি পথ ঠিক করে মাল কবে পৌঁছবে

    ত্রিপুরার দোকান প্রায়ই সেখানে, যেখানে রাস্তা পাহাড়ে উঠছে, আর বর্ষায় সোমবারের জন্য রওনা দেওয়া ট্রাক বুধবারে আসতে পারে। দূরের এক ক্রেতাকে সপ্তাহের জন্য বেতের মোড়ার কথা দেওয়া আছে, আর পরের ব্যাচের বেত ওই দেরি করা ট্রাকেই আসছে। উৎসবের সেটের জন্য তাঁতির কাপড়ও তাতে। তিনি ফোন করেন, আর আপনি বলতে পারেন না তাঁর অর্ডার শুক্রবারে যাবে, না তার পরের মঙ্গলবারে।

  3. কাপড়, বেত আর আনারস বিক্রি হয় পরে দেওয়ার কথায়

    তাঁতি, বেতের কারিগর আর আনারস চাষি কাজ তৈরি হলে বিক্রি করেন, টাকা আসার সময়ে নয়। একটা পরিবার আজ রিসা নিয়ে যায় বা বেতের মোড়া, ফসল বেচে টাকা দেয়। দোকান সেটা লেখে এমন খাতায়, যা পরিবারের সবার হাত ঘুরেছে। এক মাস পরে কেউ বলতে পারে না কোন পাতাগুলো মেটানো হয়ে গেছে। টাকা পাওনা আছে, কিন্তু নাম, তারিখ আর ছোট চিরকুটে ছড়িয়ে।

গড়িয়ার ছবি: কমলা আর হলুদ ফুলের মালার নিচে ফিতে বাঁধা দুটো ঢাক, সঙ্গে বাঁশের খুঁটি আর বাঁশি
গড়িয়ার ছবি: কমলা আর হলুদ ফুলের মালার নিচে ফিতে বাঁধা দুটো ঢাক, সঙ্গে বাঁশের খুঁটি আর বাঁশি
খার্চির ছবি: বাঁশের কাঠামোয় মেলার দোকান, ফুলের মালা, ছোট প্রদীপ আর কাগজের পতাকায় সাজানো
খার্চির ছবি: বাঁশের কাঠামোয় মেলার দোকান, ফুলের মালা, ছোট প্রদীপ আর কাগজের পতাকায় সাজানো

বেতের কারখানার মেঝে থেকে ফসল তোলার পর টাকা দেওয়া পরিবার পর্যন্ত

  • নগদ, UPI আর কথা দেওয়া, শেষে আলাদা করে বোঝা

    গড়িয়া আর খার্চির সন্ধ্যায় দোকান ভরে থাকে এমন লোকে যাঁরা বলেন পরে দেবেন। কথা দেওয়াদের নামগুলো ঝাঁপ নামার আগে একটা একটা করে খাতার পাতায় যায়। নগদে আর UPI-তে যা দেওয়া হয়েছে তা বাক্সে আর ফোনে আছে, তার জন্য পাতার দরকার নেই।

  • দূরের ক্রেতার বেত পাহাড়ি রাস্তায় আটকে, আর বিলও তার সঙ্গে অপেক্ষা করে

    দূরের এক ক্রেতা তাঁর বেতের অর্ডারের কিছুটা টাকা দিয়েছেন, আর পাহাড়ি রাস্তার ট্রাক দেরি করছে। সেদিনই যা তিনি দিয়েছেন তার একটা বিল বানান। বাকিটার দ্বিতীয় বিল বানানো হয় বেত পাঠানোর সময়, রাস্তা যখনই ছাড়ে। দুটোই তাঁর নামে থাকে, তাই কী কথা হয়েছিল তা কাউকে মনে রাখতে হয় না।

  • শ্রমিকরা মাঠ থেকে ফিরলে দোকান খোলে

    বাগান এলাকায় মাঠের কাজই ঠিক করে দোকানের সময়। শ্রমিকরা বিকেলে দোকানের পাশ দিয়ে ফেরেন, আর তখনই দোকান খোলে। সেই প্রথম ব্যস্ত ঘণ্টায় প্রতিটি বিক্রির বিল বানান, তাহলে সন্ধ্যায় পাইকারের অর্ডার শুরু হয় বিকেলের তালিকা থেকে, ক্লান্ত মাথা থেকে নয়।

ধলাইয়ের গণ্ডাছড়ায় বাঁশের বেড়ার ঘরের সামনে নীল আর লাল সুতোয় টানা একটা কোমর-তাঁত
ধলাইয়ের গণ্ডাছড়ায় বাঁশের বেড়ার ঘরের সামনে নীল আর লাল সুতোয় টানা একটা কোমর-তাঁত ছবি: Piyushozarde, CC BY-SA 4.0
সোনালি রঙের ফুল-পাতার পাড় বোনা, ভাঁজ করা লাল রিগনাই কাপড়
সোনালি রঙের ফুল-পাতার পাড় বোনা, ভাঁজ করা লাল রিগনাই কাপড় ছবি: Tirengma, CC BY-SA 4.0

উত্তর ত্রিপুরার আনারস, ধলাইয়ের চাষের কাজ: জেলাগুলো কীভাবে রোজগার করে

ত্রিপুরার জেলাগুলো আলাদা আলাদা ভাবে রোজগার করে, আর আপনার দোকানে যাঁরা ঢোকেন তাঁরা সেখান থেকেই আসেন।

  • উত্তর ত্রিপুরায় ধান, আনারস, কাঁঠাল, কমলালেবু, লিচু আর কলা হয়, আর চা বাগান আর রবার বাগানেও মানুষ কাজ পান।
  • ধলাই জেলায় ৭৬ শতাংশ কর্মী চাষের ওপর নির্ভর করেন। জেলার ওয়েবসাইট বাজারের সুবিধা কম থাকাকে পিছিয়ে থাকার একটা কারণ বলেছে, যদিও এনএইচ ৪৪ জেলাকে জুড়েছে।
তেরছা কাটা দাগ আর নীল বাটি লাগানো রবার গাছ, সবচেয়ে কাছের গাছের গোড়ায় কালো কষের বাটি
তেরছা কাটা দাগ আর নীল বাটি লাগানো রবার গাছ, সবচেয়ে কাছের গাছের গোড়ায় কালো কষের বাটি ছবি: unknown, CC BY 2.0

বর্ষা, উৎসবের সপ্তাহ আর সাপ্তাহিক হাটে ত্রিপুরার দোকানে যা কাজে লাগে

  • বাকির খাতা

    দূরের যে বেতের ক্রেতা মাল পেয়ে টাকা দেন তাঁর একটা পাতা, প্রতিটি বিল আর প্রতিটি টাকা তাতে, যাতে হিসাব ওপর থেকে নিচে পড়া যায়।

  • ফোনে বিল

    খার্চির ঠেলাঠেলিতে মালার ফুল আর সুতোর দু'লাইনের বিল পরের জন এগিয়ে আসার আগেই খদ্দেরের ফোনে।

  • আপনার নিজের অনলাইন দোকান

    কারখানার জন্য অনলাইন দোকানের পাতা, এই সপ্তাহে কী তৈরি তা সহ, পাহাড়ের ওপার থেকে যাঁরা অর্ডার দেন তাঁদের জন্য।

  • গুদামের স্টক

    পাহাড়ের নিচের গুদামের চাল আর টিনের পাত, ওপরের দোকানের তাক থেকে আলাদা গোনা, যাতে দেরি করা ট্রাক হিসাবেই ধরা পড়ে।

  • রোজের রিপোর্ট

    গত বছরের গড়িয়া আর খার্চির দিনগুলো আবার খুলে দেখুন, যাতে এ বছরের মাল কেনা হয় যা বিক্রি হয়েছিল তার ভিত্তিতে, আশার ওপর নয়।

শুরু করার আগে ত্রিপুরার দোকানদাররা যা জিজ্ঞেস করেন

দূরের এক ক্রেতার অর্ডারের বেত বৃষ্টিতে আটকে পড়া একটা ট্রাকে। তাঁকে কী বলব?

আগে ওই জিনিসের গোনা দেখুন। বেত দোকানে না থাকলে তিনি কিছু দেওয়ার আগেই তাঁকে জানিয়ে দিন। তাঁর পাতায় অর্ডার থেকে যায়, তাই রাস্তা বন্ধ থাকার সময় কিছু হারায় না।

এক ক্রেতা দু'মাস ধরে চল্লিশটা বেতের মোড়া বানিয়ে নিতে চান। প্রতিটা তৈরি হতেই আলাদা বিল করা যায়?

হ্যাঁ। মোড়ার প্রতিটা ধরন নিজের দর সহ একটা জিনিস। মোড়া কারখানা থেকে যেমন বেরোয়, ক্রেতার পাতায় তেমন বিল করুন, আর পাতায় অর্ডারের চলতি মোট দেখা যায়।

আমার দোকান শুধু সন্ধ্যায় খোলে, যখন কাজ সেরে শ্রমিকরা হেঁটে ফেরে। সকালে কী পড়ব?

গত রাতের রিপোর্ট খুলুন। তাতে দেখা যায় শ্রমিকদের পরিবার কী কী নিল, জিনিস ধরে ধরে, আর কোন কোন বিল কোনো পাতায় গেছে। সকালেই বুঝে যান পরের সন্ধ্যার ভিড়ের আগে পাইকারের কাছে কী চাইবেন।

দোকান শহরে, কিন্তু বেত আসে গ্রামের কারখানা থেকে। কারখানার জিনিস কি আমার স্টকে থাকতে পারে?

হ্যাঁ। কারখানা যে জিনিস পাঠায় তার প্রতিটা আপনার স্টকে নিজের গোনা সহ একটা জিনিস, আর কী এল তা লিখলে গোনা বাড়ে। ফোনে দেখা যায় তাকে কী আছে আর কী এখনও আসছে।

সব দোকানের আরও প্রশ্ন

বেত, কাপড় আর আগর গাছ নিয়ে ত্রিপুরার জেলার ওয়েবসাইট যা বলে

পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার ওয়েবসাইট রপ্তানির তালিকায় বেত আর বাঁশের চেয়ার, টেবিল, মাদুর, টুপি আর ব্যাগের নাম করেছে, আর বলেছে তাঁতের জিনিস পূর্বাশা সরকারি এম্পোরিয়ামে বিক্রি হয়। সেখানকার দোকান কাছেই তৈরি হওয়া জিনিস নিয়ে কারবার করে।

দক্ষিণ ত্রিপুরার অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে চাষ, পশুপালন আর মাছচাষের ওপর। সেখানে ধান, আনারস, কাঁঠাল আর কলা হয়, আছে চা বাগান, রবার আর বাঁশের বাগান। সেখানকার কাউন্টারের মানুষ মাটি আর জলের ওপর নির্ভর করে বাঁচে।

ত্রিপুরার আগর শিল্পে আনুমানিক ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ জোগায় উত্তর ত্রিপুরা, যেখানে প্রায় ১৫,০০০ পরিবার আগর গাছ লাগায় আর প্রক্রিয়া করে। অর্থাৎ একটা জেলায় এমন বহু পরিবার আছে, যাদের আয় একটাই ফসল থেকে আসে।